Menu Close

অপটিক্যাল ফাইবার (Optical Fiber):


অপটিক্যাল ফাইবার হ্যালো পাতলা, সরু, স্বচ্ছ বিশুদ্ধ কাঁচ তন্তু। এটি মূলত একটি পাতলা  তার, যাকে প্লাস্টিক বা কাচ তন্তু দিয়ে তৈরি করা হয়। যা দিয়ে আলোকরশ্মি পরিবহন হয়। ফাইবার অপটিকালের এবং ফলিত বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শাখা যেখানে অপটিক্যাল ফাইবার নিয়ে গবেষণা করা হয়। অপটিক্যাল ফাইবার এর মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনেক বেশি ডাটা ট্রান্সফার করা যায়। এটি প্রতি সেকেন্ডে ১০০ টেরাবাইট ডাটা আদান-প্রদান করতে পারে।

সুবিধাঃ


অপটিক্যাল ফাইবার এর মাধ্যমে অনেক দূরত্ব কম সময়ের মধ্যে ডেটা পরিবহন করা হয়। অপটিক্যাল ফাইবার এর মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফারের সুবিধাগুলো হলো –

  • খুবই সামান্য পরিমাণের ডেটা ক্ষয় হয়

  • তাড়িতচৌম্বকীয় প্রভাব পড়ে না

  • সামান্য সময়ের মধ্যে অনেক দূর দূরান্তে আদান-প্রদান করা যায়।

এছাড়াও আরো অনেক রকমের সুবিধা পাওয়া যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। অপটিক্যাল ফাইবার দেখতে মানুষের মাথার চুলের চেয়েও শুরু। সম্পূর্ণ ফাইবার তারের মাধ্যমে আলোক রশ্মি ব্যবহার করে অনেক দূর দূরান্তে অনেক বেশি ডেটা প্রেরণ করা যায়। বিদ্যুতের চেয়েও অনেক দ্রুত সময় এর মাধ্যমে অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারি। অপটিক্যাল ফাইবারে বিদ্যুতের সেন্সর ব্যবহার করা হয় না। ফাইবার তারের মূল্য সাধারণ তারের তুলনায় অনেক বেশি। এটির মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার গতিবেগে তথ্য প্রেরণ করা সম্ভব হয়।

ইতিহাসঃ


১৮৪০ সালে প্যারিসে প্রথম  প্রতিসারণ এর মাধ্যমে আলোকরশ্মি প্রেরণ এর ধারণা আবিষ্কার করে জ্যাকিস বেবিনেট ও ডেনিয়েল কোলাডন। তারও ১২ বছর পর ১৮৫২ সালে লন্ডনের প্রযুক্তিবিদ টিন্ডাল তার ধারণা ব্যক্ত করেন। ১৯৭০ সালে তিনি একটি বই প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি আলোক রাশির ধর্ম এবং পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন আলোক রশ্মি যখন বায়ু থেকে পানি মাধ্যমে যায় তখন আলোকরশ্মি অভিলম্বের দিকে চলে আসে এবং যখন পানি থেকে বায়ুতে আলোকরশ্মি পাঠানো হয় তখন অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। এই ধর্ম থেকে তিনি আবিষ্কার করেন যে আলোকরশ্মি পানিতে প্রতিসরণের সময় যদি আলোক রশ্মি কে ৪৮° এর বেশি কোনে পানিতে অবতরণ করলে তা কোনমতেই প্রতিসারীতো হয়না তখন আলোকরশ্মি পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন সৃষ্টি করে। আর যে মান থেকে আলোকরশ্মির পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হয় সেই কোনকে সংকট কোণ বলা হয়। পানি , কাচ এবং হীরার ক্ষেত্রে সংকট কোণের মান যথাক্রমে ৪৮°২৭’ , ৩৮°৪১ এবং ২৩°৪২’ হয়।

২০ শতকের শুরুর দিকে দেহের ভিতর আলোকিত করার জন্য বাঁকানো কাচনলকে  আলোক সঞ্চা্র পথ রূপে ব্যবহার করা হতো। এই একই সময়ে ডেন্টাল কেয়ার এ মুখের ভীতর আলোকিত করার জন্য প্রথম সরূ কাচ নলের ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯২০ সালে নলের মধ্য দিয়ে প্রতিবিম্ব প্রেরণের পদ্ধতি প্রথম চালু করেন লজি বেয়ার্ড ও ক্ল্যারেন্স হ্যানসেল।

১৭৯০ সালে অপটিক্যাল কনসেপ্ট এর মাধ্যমে যোগাযোগ আবিষ্কার করেন ফরাসি বিজ্ঞানী ক্লাউড চ্যাপেল। এই পদ্ধতির মাধ্যমে একটা টাওয়ার থেকে অন্য টাওয়ারে বার্তা প্রেরণ করা হতো। কিন্তু ইলেকট্রন টেলিগ্রাফ আসার পর এই পদ্ধতি অচল হয়ে পড়ে। পরে ১৮৮০ সালে বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম অপটিক্যাল টেলিফোন আবিষ্কার করে। যা পরবর্তীতে সকলের কাছে ফটো ফোন নামে পরিচিত ছিল। এরপর তিনি আলোক সিগন্যাল বাতাসে প্রেরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি তাতে অসফল হন।

১৯৫০ এর দশকে অপটিক্যাল ফাইবার প্রাথমিকভাবে আবিষ্কৃত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এন্ডোস্কপির জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৬০ দশকে ইঞ্জিনিয়াররা এটি ব্যবহার করে টেলিফোনে কল প্রেরণ করতো। তারপর থেকে ধীরে ধীরে আজকের এই অপটিক্যাল ফাইবার তৈরি হয়েছে।

প্রকারভেদঃ


অপটিক্যাল ফাইবার প্রধানত দুই প্রকার

  • “সিঙ্গেল মোড অপটিক্যাল ফাইবার” এটি দূর-দূরান্তে ডাটা প্রেরণ করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

  • “মাল্টিমোড অপটিক্যাল ফাইবার” এটি স্বল্প দূরত্বে ডেটা প্রেরণ করার কাজে ব্যবহার করা হয়।

গঠনঃ


অপটিক্যাল ফাইবারের ক্যাবল এর গঠন তিন স্তরে থাকে তথা –

  • কোর

  • ক্লাডিং

  • জ্যাকেট

কোরঃ অপটিক্যাল ফাইবারের সবচেয়ে ভিতরের অংশকে কোর বলে। আলোক সিগন্যাল মূলত এটার মধ্য দিয়েই ড্রপ খেয়ে সামনের দিকে চলাচল করে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। এটি স্বচ্ছ কাঁচ বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। এর ব্যাস ৮-১০০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত।

ক্লাডিংঃ অপটিক্যাল ফাইবারের ভিতরের অংশ কে কোর বলে এবং কোরের চারিদিকে আবৃত অংশকে ক্লাডিং বলে। ক্লাডিং কাচ বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। কোর থেকে নির্গত আলোকরশ্মি ক্লাডিং এর গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিফলিত হয় আবার অন্য জায়গায় ধাক্কা খায় আবার সেখান থেকে প্রতিফলিত হয় এভাবে সামনের দিকে চলে। ক্লাডিং এর ব্যাস হল ১২৫ মাইক্রো মিটার।

জ্যাকেটঃ ক্লাডিং এর বাইরের অংশকে জ্যাকেট বলা হয়। এটি প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। যার কারণে অপটিক্যাল ফাইবারে জলীয় বাষ্প বা মরিচা ধরে না। এর ফলে এর জীবনকাল অনেক দিন থাকে।

 

অপটিক্যাল ফাইবার আলাদা আলাদা বিষয়ের উপর নির্ভর করে । যেমন ব্যবহার হাওয়া , প্রতিসারঙ্ক , এবং আরো প্রচার এর গতির উপর ।

 

অপটিক্যাল ফাইবার “টোটাল ইন্টার্নাল রিফ্লেকশন” এর নীতির উপর কাজ করে । সম্পূর্ণ ক্যাবলের ভিতর আলোকরশ্মির একটি পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে চলতেই থাকে কোনো রকম বাধা ছাড়াই । তারের ভিতরে আলোকরশ্মির যাত্রা সমতল এবং সমান ভাবে চলে না । যেহেতু ফাইবার তার এক নয় তাই আলকরা সীতার এর ভিতরে বাউন্স খেতে খেতে সামনের দিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগোতে থাকে । অপটিক্যাল ফাইবারের যেখান থেকে ডেটা সংগ্রহ করা হয় সেখানে একটি ট্রান্সমিটার লাগানো থাকে । ট্রান্সমিটার এর সাথে সংযুক্ত অপটিক্যাল ফাইবার তারের মাধ্যমে ডাটা গ্রহণ বা প্রেরণ করা হয় । যে ডিজিটাল ডাটা আলোক রশ্মির সাহায্যে অপটিক্যাল ফাইবারে প্রেরণ করা হয় সেগুলো রিসিভ করার পর বাইনারিতে বদলে দেওয়া হয় । এর মাধ্যমে আমাদের ডিজিটাল ডিভাইস এই যেটা বুঝতে পারে এবং আমাদের কাছে প্রদর্শন করতে পারে ।

 

অনেক কোম্পানিই অপটিক্যাল ফাইবার তৈরি করে । যার জন্য অপটিক্যাল ফাইবারের নির্দিষ্ট মান আবিষ্কার করা হয়েছে  । ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিনিউকেশন ইউনিট ফাইবার সম্পর্কিত কিছু মান প্রকাশ করেছে ।

 

  • ITU-T G .651,”50/125 multimode  Graded index

  • ITU-U G .652 single mode

বিশ্বের আরো অনেক সংস্থা অপটিক্যাল ফাইবার এর বিভিন্ন মান প্রকাশ করেছে । যেগুলো অপটিক্যাল ফাইবারের কর্মক্ষমতা নির্দেশ করে ।

 

  • গিগাবাইট ইথারনেট

  • FDDI

  • ফাইবার চ্যানেল

  • HIPPI

  • SDH

  • SONET

 

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে ডাটা পাঠানোর সুবিধা :

 

  • এই তারের মাধ্যমে অনেক কম সময়ের মধ্যে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করে ডাটা পৌঁছে দিতে পারে ।

  • ইলেক্টো ওয়ার এর তুলনায় অপটিক্যাল ওয়ার ৫০% থেকে ১০০% বেশি ব্যান্ডউইথ দ্রুত ভাবে পাঠাতে সক্ষম ।

  • অন্য সকল তারে তুলনায় অপটিক্যাল ফাইবার অনেক বেশি পরিমাণে ডাটা এক্ষেত্রে প্রেরণ করা সম্ভব ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার এর মাধ্যমে অনেক দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইন্টারনেট প্রেরন করা সম্ভব । যার ফলে আমরা দ্রুতগতির ইন্টারনেট পরিষেবা পেয়ে থাকি ।

  • অপটিক্যাল ফাইবারে খুবই খারাপতম আবহাওয়া প্রভাব ফেলে না । তাই এটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার একটি ড্রাইলেকট্রিক গঠন করে । যার জন্য চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং রেডিও তরঙ্গ কোন প্রভাব ফেলতে পারে না ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার ডিজিটাল স্যুইচিং সিস্টেম এর জন্য খুবই উপযুক্ত ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার সম্পূর্ণ শব্দ মুক্ত ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার খুবই কম জায়গা দখল করে যার জন্য যেকোনো জায়গায় সহজ ভাবে ইন্সটলেট করা যায় ।

 

সকল জিনিসের মতোই অপটিক্যাল ফাইবারের অনেক সুবিধা সাথে কিছু অসুবিধাও রয়েছে । যেগুলোর নিচে উল্লেখ করা হলো:

 

  • ইনস্টলেশন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সকল কোন সাধারণ লোক পারেনা । এর জন্য দক্ষ প্রকৌশলী প্রয়োজন হয় ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার যেহেতু কাচ তন্ত ব্যবহার করা হয় তার জন্য এটি সহজেই ভেঙে যায় । এর ফলে যখন এটি ইনস্টলেশন করা হয় তখন খুবই সাবধানতার সাথে এই কাজটি করতে হয় ।

  • অপটিক্যাল ফাইবার খুবই ব্যয়বহুল

  • অপটিক্যাল ফাইবার এর মাধ্যমে ডাটা আলোক রশ্মির মাধ্যমে চলাচল করে এই জন্য এরজন্য ডাটা টি নিরাপদ ভাবে চলাচল করতে পারে । এর ফলে অপটিক্যাল ফাইবার এর সিকিউরিটি ভাঙ্গা সহজ নয় ।

 অপটিক্যাল ফাইবারের ব্যবহার ,

  • কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং

  • ব্রডকাস্টিং

  • মেডিকেলে স্ক্যানিং

  • সম্প্রচার

  • সামরিক সরঞ্জাম

এছাড়া আরো ইত্যাদি কাজে এই অপটিক্যাল ফাইবার আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করি ।

অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!