Menu Close

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Ishwar Chandra Vidyasagar):


যুগে যুগে বাংলার বুকে যে মহাপুরুষগণ বাংলা ও বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তাদের একজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিত, লেখক, শিক্ষাবিদ ,সমাজসংস্কারক । তিনি বাংলা লিপি সংস্কার করেছিলেন । হিমালয়ের মতো বিশাল ঈশ্বরচন্দ্র শুধুমাত্র বিদ্যাসাগরের ছিলেন না তিনি ছিলেন করুণার সাগরও । কুসংস্কার এবং সামাজিক অভিশাপ দূরকরনে তার অক্লান্ত পরিশ্রম এর জন্য বাংলার মানুষ আজও তাকে স্মরণ করে । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাধারণ মানুষের কাছে “দয়ার সাগর” নামে পরিচিত ছিলেন । দরিদ্র অসহায় এবং পীড়িত মানুষ তার কাছ থেকে কোন সময়ই খালি হাতে ফিরে যেতে পারেনি । মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীনতম ঋষির প্রজ্ঞা ।

চন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর

 

জন্মঃ                                                ১৮২০  সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর

                                                        হুগলি জেলার বীরসিংহ গ্রামে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত

মৃত্যুঃ                                                 ১৮৯১ সালের ২৯ শে জুলাই

                                                        কলকাতা, ব্রিটিশ ভারত

ছদ্মনামঃ                                           কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপু

পেশাঃ                                              লেখক ,দার্শনিক, পন্ডিত, শিক্ষাবিদ

                                                       প্রকাশক, সংস্কারক ,অনুবাদক।

জাতীয়তাঃ                                      তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত

শিক্ষাঃ                                            সংস্কৃত কলেজ ( ১৮২৮ – ১৮৩৯)

আন্দোলনঃ                                       বাংলা নবজাগরণ

উল্লেখযোগ্য রচনাঃ                          আমার অতি স্বল্প হইল (১৮৭৩)

                                                      ব্রজোবিলাস(১৮৮৪)

                                                      বর্ণপরিচয় ,কথামালা, বেতাল পঞ্চবিংশতি

জম্মঃ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আসল নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় । তার জন্ম হয়েছিল হুগলি জেলার বীরসিংহ গ্রামে । ২৬ শে সেপ্টেম্বর ১৮২০ সালে তার জন্ম । তার বাবার নাম ছিল ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় । তার মা তার নাম ছিল ম গঙ্গাবতি বন্দ্যোপাধ্যায় ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে ওঠেন সে বাড়ি বর্তমানে পাঠাগার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে । এই পাঠাগার আছে বিদ্যাসাগর ব্যবহৃত প্রায় 200 টিরও অধিক বই ।

 

শিক্ষা জীবনঃ

চার বছর 9 মাস বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় স্থানীয় পাঠশালায় । ওই পাঠশালায় সনাতন বিশ্বাস নিয়ে শিক্ষাদান করা হতো । কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সনাতন ধর্ম বিশ্বাস বিজ্ঞানের চেয়ে শাস্তি প্রদান ই বেশি আনন্দ পেত । পরবর্তীতে পার্শ্বীয় গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে এক উৎসাহী যুবক বীরসিংহ গ্রামে নতুন এক পাঠশালা তৈরি করে । মাত্র আট বছর বয়সে ওই পাঠশালায় ভর্তি হয় ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চোখে কালীকান্ত ছিলেন তাঁর জীবনের দেখা সবচেয়ে ভালো আদর্শ শিক্ষক । কালীকান্ত পাঠশালায় তিনি সেকালের বাংলা শিক্ষা লাভ করে ।

১৮২৮ সালে পাঠশালার শিক্ষা শেষ করে ।  তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় পাড়ি দেন । তখন তার সঙ্গে গিয়েছিল তার শিক্ষক কালীকান্ত এবং তাদের চাকর আনন্দরাম। তিনি প্রায় নিজের পায়ে হেঁটে কলকাতায় পৌঁছেছিলেন দীর্ঘ ৫২ মাইল পথ অতিক্রম করে । শোনা যায় পথ চলার সময় পথের মাইলফলক দেখে তিনি ইংরেজি সংখ্যা অল্প অল্প আয়ত্ত করে ফেলে । তখন তারা কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে বিখ্যাত সিংহ পরিবারের তারা আশ্রয় নেন । । তখন কাজের সূত্রে তার বাবা কলকাতায় থাকতেন ।

লোকমুখে শোনা যায়  ঈশ্বরচন্দ্র এর লেখাপড়ার প্রতি এত আগ্রহ ছিল যে বাসায় বাসায় তার পরিবারের আলো জ্বালানোর সামর্থ্য না থাকায় রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তিনি পড়ালেখা করতেন ।

১৯২৯ সালের একই জুন কলকাতায় গিয়ে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন । তিনি ব্যাকরণ এর তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। প্রায় সাড়ে তিন বছর তিনি ওই শ্রেণীতে অধ্যায়ন করেন । ১৮৩০ সালে ব্যাকরণ এর সাথে সাথে ঐ একই কলেজে তিনি ইংরেজি বিষয়ের উপরে ভর্তি হন । ১৮৩১ সালের বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পরীক্ষায় সফল হন । তার এই রেজাল্ট টা দেখে কর্তৃপক্ষ খুশি হয় তাকে প্রত্যেক মাসে ৫ টাকা করে উপবৃত্তি প্রদান করেন । সেইসঙ্গে বাংলা ব্যাকরণ এর একটি গ্রন্থ আউট স্টুডেন্ট এবং ৮ টাকা পুরষ্কার প্রদান করেন । তিনি ব্যাকরণ সিরিজ নিতে পারবেন শেষ করে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি কাব্য শ্রেণীতে প্রবেশ করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর ছাত্র হিসেবে ও দুই টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন। ইংরেজি বিষয়ের উপর ষষ্ঠ শ্রেণীতে পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কে ৫ টাকা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক উপহার দেন ।

 

দাম্পত্য জীবনঃ

১৮৩৪ সালে শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দীনময়ী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ সম্পন্ন হয় । দ্বিতীয় বর্ষ সাহিত্য পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হবার পর তিনি মাত্র ১৫ বছরে প্রবেশ করেন অলংকার শ্রেণীতে । অলংকার শাস্ত্র একটি কঠিন বিষয় । কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মাত্র এক বছরের মধ্যে অলঙ্কারশাস্ত্র উত্তীর্ণ হয়ে যায় । ১৮৩৬ সালে তিনি অলংকার পাঠ শেষ করে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার পেয়ে উত্তীর্ণ হয় । এর জন্য তাঁর প্রত্যেক মাসের বৃত্তি বেড়ে দাঁড়ায় ৮ টাকা । এ বছরই তিনি স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি হন । কিন্তু এই স্মৃতি স্মৃতি ভর্তি হবার পূর্বে বেদান্ত এবং ন্যায় দর্শন বিষয়ে পড়তে হয় । কিন্তু ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেধা এতই ছিল যে কর্তৃপক্ষ তাকে সরাসরি স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেয় । এই সিডনিতেও তিনি কৃতিত্বের সাথে সফলতা অর্জন করে উত্তীর্ণ হয় । হিন্দু ল কমিটি পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয় । ত্রিপুরায় তিনি জেলা জজ নিতে ভর্তি হবার সুযোগ পেলেও তার বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বেদান্ত শ্রেণীতে ভর্তি হন । ১৮৩৮ সালে তিনি বেদান্ত পাঠ শেষ করেন । এই সমাজ সংস্কৃতিতে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ রচনায় তিনি ১০০ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন । ১৮৪০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র ন্যায় শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ন্যায় শ্রেনিতে প্রথম স্থান অধিকার করার জন্য তাকে ১০০ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ।

১৮৩৯ সালে তিনি যে হিন্দু ল পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে একটি প্রশংসাপত্র প্রদান করেন।১৬ ই মেয়ে ল কমিটির কাছ থেকে তিনি প্রশংসাপত্রটি গ্রহণ করেন ।।সেই প্রশংসাপত্রে তার নামের সাথে বিদ্যাসাগর নামটি জুড়ে দেওয়া হয় ।

১৯৪১ সালে তিনি মোট সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা গ্রহণ করেন ১২ বছর পাঁচ মাস। ডিসেম্বর মাসে দেবনাগরী ভাষায় সংস্কৃত প্রশংসাপত্রে কলেজের অধ্যাপক তাকে বিদ্যাসাগর নামে ভূষিত করে । কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যায়নের সময় ঈশ্বরচন্দ্র এর কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তাকে এই “বিদ্যাসাগর” উপাধি দেওয়া হয় । সেই থেকে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে সকলের কাছে পরিচিত । ১৮৪১ সালে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন ।

 

কর্মজীবনঃ

তারপর তিনি ২১ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পন্ডিত হিসেবে কাজ করা শুরু করেন । সেখানে কিছুদিন কাজ করে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজ এ কাজ করা শুরু করে । তারপর তিনি ওই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন ।

তিনি প্রায় ছয় মাসের মধ্যে বাংলার সাধারণ এবং দরিদ্র মেয়েদের জন্য ৪০ এর উপরে স্কুল প্রতিষ্ঠাতা করে । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী থেকে জানা যায় তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত সময় নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে গিয়েছেন । ইশ্বরচন্দ্র সমাজে যা যা চেয়েছিলেন’ সেগুলো হলো ;

  • সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ দূর

  • বিধবা নারীদের বিবাহ প্রচলন করে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ।

  • বহুবিবাহ এর হাত থেকে নারীদের মুক্তি আরো ইত্যাদি

তখনকার সময়ে সমাজের হিন্দু এবং মুসলমান সমাজের মেয়েদের অবস্থা খুবই খারাপ এবং শোচনীয় ছিল । সমাজে মেয়েদেরকে সব সময় ছোট করে দেখা হতো । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই রীতি কে পরিবর্তন করতে চেয়েছে তিনি সবসময় মেয়েদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য লড়াই করে গিয়েছে তার জীবনের সমস্ত সময় । বাংলায় নারী শিক্ষা বিস্তারের তার ভূমিকা ছিল অনেক । তাকে নারী শিক্ষার পথপ্রদর্শক বলা হত । তিনি সবসময় বলতেন নারী শিক্ষার উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ এর উন্নয়ন ঘটবে না ।

এরই ধারাবাহিকতায় তিনি কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে । সেটি প্রথম ভারতের মেয়ে বিদ্যালয় ছিল । বিদ্যাসাগর ছিলেন সেই বিদ্যালয়ের সম্পাদক । বর্তমানে ওই বিদ্যালয়টি বেথুন স্কুল নামে পরিচিত ।

এসব বাংলা মডেল স্কুল ছাড়াও তিনি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখনকার সমাজে কুসংস্কার ভরা ছিল । নারীদের শত শত সংস্কার পালন করার অজুহাত দেখিয়ে তাদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখা হয়েছিল । তাদের সমাজের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার দেওয়া হয়নি । তারা সবাই মনে করত নারী শিক্ষার নিষিদ্ধ এবং এতে পাপ হয় । তার জন্য সমাজের স্কুল প্রতিষ্ঠা না করার জন্য তীব্র প্রতিবাদের সৃষ্টি হয় । সমাজের সকল পুরুষরা কোন ভাবেই মানতে পারছিল না যে নারীরা স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করবে । সরকার এই আন্দোলনের মুখে পড়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায় যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে কিনা । অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারী শিক্ষা এবং নারী শিক্ষার পক্ষে । তিনি সমাজের সকল সাধারণ লোককে বুঝাতে চান যে সমাজের পুরুষদের সাথে সাথে নারীদের শিক্ষার প্রয়োজন । যে সমস্ত কাজ পুরুষরা করতে পারে সে সমস্ত একই কাজ নারীরাও করতে পারে । এজন্য তিনি আন্দোলন করতে শুরু করেন । সরকার তার এই মনোভাব দেখে তাকে স্কুল প্রতিষ্ঠাতা দায়িত্ব দেয় । তিনি বালিকা বিদ্যালয় খোলার জন্য সমর্থন আদায়ের জন্য গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে ।

১৮৫৭ সালে তিনি তার নিজ গ্রাম বর্ধমান জেলায় আরো একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে । তিনি প্রায় এক বছরেরও কম সময়ে নারীদের শিক্ষার উন্নতির জন্য গ্রামে বাংলায় প্রায় ৩৭ টির ওপরে স্কুল প্রতিষ্ঠাতা করে নিজের অর্থায়নের ভিত্তিতে । তিনি শুধু বাংলার নারীদের শিক্ষিত করতে চাননি বাংলার স্ত্রীদেরও তিনি শিক্ষার আলো তে নিয়ে যেতে চেয়েছিল এবং এ থেকে সমাজের ছেলেরাও বাদ যায়নি ।

ঈশ্বরচন্দ্র যে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিল সেই গ্রামের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল । তিনি তাদের শিক্ষার আলোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গ্রামে শ্রমিকদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ।

১৮৭২ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় একটি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছিলেন । যা বর্তমানে “বিদ্যাসাগর কলেজ” নামে সুপরিচিত সবার কাছে ।সমাজের সাঁওতাল এবং দরিদ্র মানুষের অসুখ বিসুখ রাঘব এর জন্য তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন তাদের । তিনি তখন তার ৬০ বছর বয়সে কঙ্কাল কিনে এনে সেই কঙ্কালকে হাতে-কলমে দেখে দেখে সেই সকল দরিদ্র ছেলে মেয়েদের শিক্ষা দিতেন ।

সমাজের সকল ধরনের কুসংস্কার এবং প্রথার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতেন এবং আন্দোলন করতেন যার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন । তিনি যে শুধু মানুষজনদের শিক্ষা নিয়ে ভাবতেন তারা তিনি বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন । বাংলা গদ্য সৃষ্টিতে তার অবদান ছিল । তিনি বাংলা গদ্যের জনক।

সাহিত্য সাধনাঃ

বিদ্যাসাগরের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে শিক্ষার বই এবং শিশুদের বর্ণপরিচয় শিক্ষা ও সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ ও তিনি তাদের শিক্ষা দেন । তিনি ঐ সকল সাধারণ মানুষের শিক্ষার মূল বাহক ছিলেন ‌। তিনি বাংলা শিশুদের কাছে বেদ গ্রন্থ তার লেখা বর্ণপরিচয় । বইটিতে তিনি এমন ভাবি লিখেছিলেন যে পরবর্তী প্রায় বেশ কয়েক প্রজন্ম ওই গ্রন্থ থেকে বর্ণপরিচয় শিক্ষা পেত ‌। তিনি এরই মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না । তিনি একের পর এক গ্রন্থে লিখে থাকেন যা সাধারণ মানুষকে এক থাপ এক ধাপ সিড়ির মত শিক্ষার আলোর কাছে পৌঁছে দিত ।

১৯৪৭ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠাতা করেছিলেন সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি নামে বইয়ের দোকান । ওই বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশ হয় তার লেখা বই পঞ্চবিংশতি । তিনি সংস্কৃত যন্ত্র নামে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন । একই বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গ্রন্থ “বেতাল পঞ্চবিংশতি” । এটি হিন্দি ভাষায় লেখা হয় । সংস্কৃতিতে প্রথম এই গ্রন্থটিতে সফলভাবে বিরাম চিহ্নের ব্যবহার করা হয় । একই বছর অন্নদামঙ্গল কাব্যগ্রন্থের পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য তিনি কৃষ্ণনগর চলে আসেন । রাজবাড়ী তে সংরক্ষিত মূল গ্রন্থে পাঠ অনুসারে পরিমার্জিত ভাবে অন্নদামঙ্গল দুই কন্ডে সম্পাদনা করেছিলেন। ১৮৪৭ সালে কলেজ পরিচালনার জন্য কলেজের সেক্রেটারির সঙ্গে মতবিরোধিতা দেখা দেয় ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর সঙ্গে । যার ফলে তিনি ওই কলেজটির চাকরি ছেড়ে দেন ।

 

সমাজ সংস্কারঃ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন আধুনিক মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তি । তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে সমাজের পালন করা এত শত কুসংস্কার এবং রীতিনীতি থাকলে সমাজে কখনো উন্নতি সাধন করা সম্ভব নয় । এজন্য তিনি বিধবা বিবাহ আইন চালু করা বাল্য বিবাহ  বন্ধ করা এবং নারী শিক্ষার জন্য আন্দোলন শুরু করে । তিনি এ সম্পর্কে অনেক অনেক লেখালেখি করেন । তার লেখার মধ্যে কেন বিধবা বিবাহ আইন চালু করা উচিত এবং বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং স্ত্রী শিক্ষা কেন প্রয়োজন সেটা মানুষকে বিস্তারিত বোঝাতে চেয়েছেন ।বিধবা বিবাহ সম্পর্কে শাস্ত্রীয় প্রমাণ দেওয়ার সহ তিনি এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করার জন্য আন্দোলন শুরু করে । এ বিষয়ে বহু আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠানো হয়। এরপর আরও 24 টি আবেদনপত্র সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয় । এসব জমা দেওয়া আবেদনপত্রে প্রায় ২৫ হাজারের উপরে স্বাক্ষর ছিল ।

কিন্তু তার এই আবেদন পত্রের বিরোধিতা করে সমাজের একদল মানুষ প্রায় ২৮০০  আবেদনপত্র সরকারের কাছে জমা দেয় । এতে তারা যুক্তি দেখিয়ে বলে এ ধরনের আইন চালু হলে সমাজের ধর্মের উপর হস্তক্ষেপ করা হবে । তাদের এই আবেদনপত্রে প্রায় ৫৫০০০ এরও বেশী স্বাক্ষর ছিল । এর জন্য বিদ্যাসাগর এর বিরোধী দলরে পক্ষের পাল্লা ভারী ছিল । কিন্তু বিদ্যাসাগরের আবেদনে সব যুক্তিবাদী তথ্য ছিল । যার জন্য সরকার বিধবা আইন প্রচলন করেন ।

১৮৫৬ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তার বন্ধুরা মিলে রক্ষণশীল সমাজের বিক্ষোভের মুখে এবং প্রচন্ড প্রতিবাদের অপেক্ষা করে তারা প্রথমে এক বিধবা নারীকে বিবাহ দেন । পাত্র ছিল সংস্কৃত কলেজের ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর সহকর্মী । তিনি ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর যুক্তি এবং তথ্যের বিশ্বাস করত এবং তিনি তাঁর সকল কিছুই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বোঝাতে চেয়েছে সকল সাধারণ মানুষকে । এছাড়াও তিনি তাঁর পুত্রের সঙ্গে এক বিধবা নারীর বিয়ে দেয়ে এক বিশাল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে । বিধবা বিবাহ সম্পন্ন হবার পর তিনি সরকারের কাছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং স্ত্রী শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য আরও আইন পাস করার জন্য আবার দরখাস্ত পাঠাতে শুরু করেন ।এইভাবে তিনি সমাজের অবহেলিত এবং অসহায় মানুষের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন । আন্দোলন করেছেন আরো অনেক বহু বহু । তিনি নবজাগরণ নিয়ে আন্দোলন করেছেন । তিনি মানুষকে নতুন এক বাংলা উপহার দিতে চেয়েছিলে যে বাংলায় থাকবে না কোনো নারীর অবহেলা যেখানে নারী-পুরুষ সবাই একসাথে মিলে কাজ করবে কেউ কাউকে অবহেলা করবে না । আর এই ধরনের সমাজ  তৈরি করা যায় তাহলে বাংলার উন্নতি নিশ্চিত । তিনি যে যে আন্দোলন করেছেন সবগুলোই যুক্তিযুক্ত এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য । তারে সব আন্দোলনে অনেক মানুষ বিরোধিতা করেছে । তারা পরে হলেও বুঝেছে যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঠিক আর তারা ভুল ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যেমন একাধারে ছিলেন অসাধারণ মেধা এবং বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ অন্যদিকে ছিল কঠোর মনোভাব । সমাজ সংস্কারের দাবিতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিরলস আন্দোলন বাংলার সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একটি নতুন রাস্তা দেখিয়ে ছিল এবং একটি সংগ্রামের ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন ।

 

২০০৪ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণমাধ্যম বিবিসি একটি জরিপ এর আয়োজন করে । যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বাংলার বিচুন মহাপুরুষ নির্বাচিত হবেন । প্রায় ৩০ দিন ধরে এই জরিপ চালানো হয় গ্রামের প্রত্যেকটি জায়গায় । এই জরিপে অষ্টম স্থান অধিকার করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । থাকে এই অবস্থানে এনে বাঙালির মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতি তার সকলের আন্তরিক ভালোবাসা ।

 

মৃত্যুঃ

১৮৯১ সালের ২৯ শে জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আমাদের ছেড়ে চলে যান ।

আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আমাদের মাঝে হয়তোবা নেই কিন্তু তার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে যে আইন এবং বাংলায় পরিবর্তন এনেছে তার জন্য তাকে বাংলার মানুষ চিরজীবন শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবেন ।

অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!