Menu Close

এ কে ফজলুল হক (A. K. Fazlul Huq):


সময় চলে যায় কিন্তু  ইতিহাস কথা বলে । আমাদের এই বাংলায় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন জ্ঞানী গুণী মানুষের জন্ম হয়েছে ‌। তারা তাদের কর্মকান্ডের জন্য , তাদের জ্ঞানের গুনে খ্যাতি অর্জন করেছে পুরো বিশ্ব জুড়ে । তেমনি একজন হলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং জনদরদি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।  তিনি বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জনে অসামান্য অবদান রেখেছে । ভেবেছেন বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য যাদের উপর জমিদার মহল অনেক অন্যায় অত্যাচার করত । তিনি তাঁর জ্ঞানের গুনে এবং তিনি যে সমস্ত কর্মকাণ্ড করেছেন তার জন্য বাংলার মানুষ তাকে চিরজীবন মনে রাখবে । বাংলার সাধারন মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তিনি সর্বপ্রথম অসামান্য ভূমিকা পালন করে ।

 

পুরো নামঃ                                       আবুল কাশেম ফজলুল হক (Abul Kasem Fazlul Huq)।

মৃত্যুঃ                                               27 শে এপ্রিল 1962 সাল

                                                      তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান , ঢাকা।

শিক্ষাজীবনঃ                                  এন্ট্রাস পাস , বরিশাল জেলা স্কুল (১৮৯০ )

                                                     স্নাতক পাস , কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ( ১৮৯৪ )

                                                     ইংরেজি ভাষায় এবং গণিতশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ ( ১৮৯৬ )

                                                     বি .এর ডিগ্রী , কলকাতা ” ইউনিভার্সিটি ল কলেজ” ( ১৮৯৭ )

                                                     তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ।

পেশাঃ                                           কলকাতার মেয়র ( ১৯৩৫ )

                                                    অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩)

                                                    পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ( ১৯৫৫ )

                                                    পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ( ১৯৫৬ – ১৯৫৮ )

পুরষ্কারঃ                                        পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক ” হেলাল’ই পাকিস্তান “

                                                    ( ১৯৫৮ )

উল্লেখযোগ্য অবদানঃ                     যুক্তফ্রন্ট গঠন এর অন্যতম নেতা ( ১৯৫৩ )

 

১৮৭৩ সালের ২৬ শে অক্টোবর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শেরে বাংলা এ কে ফজলুর হক জন্মগ্রহণ করে । তার পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিলো বরিশাল জেলার পাশে চাখার গ্রামে । তার পিতার নাম মোঃ ওয়াজেদ । তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী এবং বিশিষ্ট মোক্তার । তার মায়ের নাম সাইদুন্নেসা খাতুন । তিনি তার পিতামাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন । তার বাবার ইচ্ছে ছিল তার ছেলে ভবিষ্যৎ জীবনে আইনজীবী হবে ‌।

 

ফজলুল হকের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার বাড়ি থেকে । তিনি তার পিতামাতার কাছ থেকে বাংলা আরবি এবং ফারসি ভাষার শিক্ষা লাভ করেন । তিনি তার পরে বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি হন ।‌ ১৮৯০ সালে তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ইন্ট্রাস পাশ করেন । তারপর তাকে তার পিতা-মাতা ও উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দেয় । সেখানে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয় । শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ছিলেন তুখোড় প্রতিভাবান এবং মেধা সম্পন্ন একজন মানুষ । ১৮৯৪ সালে একই বছরের তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন গণিত এবং পদার্থবিদ্যা শাস্ত্রে উপর অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে । যেটা খুবই বিরল দৃশ্য ছিল ওই কলেজে ।  তার তুখোড় মেধা দেখে কলেজের বিভিন্ন শিক্ষকরা তার উপর বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল । তারপরে তিনি গণিত শাস্ত্রের উপর এম.এ পাঠ করলেও ইংরেজি শাস্ত্রের উপর এম.এ ডিগ্রী অর্জন করে ।

শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক Sher-E-Bangla A. K. Fazlul Huq
শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক Sher-E-Bangla A. K. Fazlul Huq

শোনা যায় তার এক বন্ধু তাকে বলেছিল মুসলমানরা গণিতে দুর্বল । তার জন্য তিনি সেই ছেলের সাথে বাজি ধরে মাত্র ছয় মাসের প্রস্তুতি নিয়ে গণিত শাস্ত্রের উপর এমএ ডিগ্রি অর্জন করে ।

 

১৮৯৭ সালে তিনি কলকাতার একটি বিখ্যাত কলেজ “ইউনিভার্সিটির ল কলেজ”থেকে বিএল ডিগ্রী অর্জন করে ।

 

তিনি আইন বিষয়ের উপর পড়াশোনা শুরু করে কলকাতার বিখ্যাত আইনজীবী আশুতোষ মুখার্জির কাছ থেকে ।  তিনি দু’বছর আইন বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করার পর আইন বিষয়ে উপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে ‌। পরে তিনি কলকাতায় আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করে । কিন্তু তিনি বেশিদিন এ কাজ করেননি । মাত্র এক বছরের মাথায় তার বাবা মারা যাবার জন্য তিনি কলকাতার আইনজীবীর চাকরি ছেড়ে বরিশালে চলে আসে । পরে তিনি বরিশালে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন ।

 

পরে তিনি ১৯০৬ আইনজীবী পেশা ছেড়ে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদান করেন । তিনি পাঁচ বছর চাকরি করে ব্রিটিশ সরকারের সাথে তার বনিবনা না হবার কারণে তিনি ১৯১১ সালে চাকরি থেকে রিজাইন করে । তিনি কিছুদিন রাত চন্দ্র কলেজের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । তিনি মানুষের সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে আবার  কলকাতায় চলে যান এবং কলকাতার হাইকোর্টের আবার আইনজীবী হিসেবে যোগদান করে ।

 ১৯০৮ সালে তিনি সমবায়ের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তিনি যখন সরকারি চাকরি করছিলেন তখন তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিল । তিনি দেখেছিলেন গ্রামের সাধারণ মানুষের দুঃখ এবং কষ্ট । আর এও দেখেছিলেন তাদের উপর জমিদার মহলের অত্যাচার এবং মহাজনদের অত্যাচার । তারপরের দিনই তার জীবনে গরিব মানুষের দুঃখ লাগবে জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন । তিনি প্রণয়ন করেছিলেন “বঙ্গীয় প্রজাতন্ত্র” আইন ব্যবস্থা ।

পরে যখন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল তখন ঢাকার চতুর্থ নবাব “স্যার খাজা ছলিমুল্লাহ বাহাদুর” মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সংগঠন তৈরি করার চিন্তাভাবনা করেন । তার কাছ থেকেই শেরে বাংলা একে ফজলুল হক রাজনীতির হাতেখড়ি হয় । এরই প্রেক্ষাপটে তিনি ১৯০৬ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স এর আয়োজন করেছিলেন । আর এই সম্মেলন থেকে জন্ম নেয় মুসলিম লীগ । এই সম্মেলনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কে আমন্ত্রণ করা হয় । এরই জন্য তিনি মুসলিম লীগ দলটির শুরু থেকে পথ চলা শুরু করেন । তাকে এই দলের সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়া হয় । এই একই সময়ে তিনি ভারতের জাতীয় দল কংগ্রেসের যুগ্ন সম্পাদক নির্বাচিত হন । পরে তিনি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন ।

খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর এর সহযোগিতায় ১৯১৩ সালে তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী রায়বাহাদুর কুমার মিত্র কে পরাজিত করে ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদে একজন সদস্য নির্বাচিত হন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক । এরমধ্যে দু’বছর কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য ছাড়া ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে থেকে ছিলেন । এছাড়াও ১৯১৩ সালে থেকে তিন বছর তিনি হক বাংলা প্রদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন । ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এর সাথেও তি ই যুক্ত ছিলেন ।

১৯১৬ সালে এ কে ফজলুল হক কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ এর মধ্যে “লক্ষ্মী” চুক্তি প্রণয়নের সহযোগ দের মধ্যে একজন । ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড তদন্তে বিশিষ্ট নেতাদের সঙ্গে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও নির্বাচিত হয়েছিলেন । ১৯২০ সালে মেহেন্দিগঞ্জে প্রদেশিক সম্মেলনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাধারণ মানুষের প্রতি অন্যায় হলে তিনি তার প্রতি প্রতিবাদ জানায় । তিনি তার জীবনে বহু আন্দোলনে যোগদান করেছেন । ১৯১৯ সালে খিলাফত আন্দোলনের তিনি যোগদান করেছিলেন ‌। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনে কংগ্রেসের নেতাদের সাথে তার মত বিরোধের সৃষ্টি হয় । ১৯২০ কংগ্রেস ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে । শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ব্রিটিশ পণ্য এবং উপাধি বর্জন এ‌ সমর্থন করেন । কিন্তু মুসলমান সম্প্রদায়ের কথা বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করার পর তিনি স্কুল-কলেজ বর্জন করার বিরোধিতা করেন । তিনি বলেন স্কুল-কলেজ বর্জন করলে মুসলমান সম্প্রদায়ের অগ্রগতির বাধাগ্রস্ত হবে । এরই প্রেক্ষাপটে তিনি কংগ্রেস বর্জন করেন । মুসলমান সম্প্রদায়ের শিক্ষার জন্য তিনি তার জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন । যার পেক্ষাপটে তিনি বাংলা শিক্ষা সম্মেলনে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ।

১৯২৪ সালে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী  পদে ছিলেন ।শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দেশের শিক্ষার অবকাঠামো মান পরিবর্তন করার জন্য তিনি বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন । তিনি “মুসলিম এডুকেশন ফ্রন্ট* গঠন করে । এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি যোগ্য এবং মেধাবী মুসলিম ছাত্রদের সাহায্য করতেন। মুসলমান ছাত্রদের জন্য ফাঁসি এবং আরবি শিক্ষার জন্য এ কে ফজলুল হক আলাদাভাবে একটি অধিদপ্তর গঠন করে । কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত সকল সরকারি কলেজে মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণের জন্য  তিনি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। তিনি বাংলা মাদ্রাসা শিক্ষার নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করেছিলেন ।

তিনি কলকাতায় কৃষক সমিতি এবং বেঙ্গল প্রজা নামের সংগঠন গঠন করেছিলেন । কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদি হতে পারেনি এগুলো স্বল্পমেয়াদী ছিল । তার গঠিত বেঙ্গল প্রজা সংগঠনটি পরবর্তীতে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি নামে আধা রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠেছিল । এই দলে আব্দুর রহিম ছিলেন সভাপতি । খান বাহাদুর আবদুল মুমিন এবং তিনি এই সংগঠনের সহ-সভাপতি ছিলেন । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই রুমে তার বক্তব্যের বিরোধিতা দেখা দেয় । ১৯৩৫ সালে এ কে ফজলুল হক এই সংগঠনের নাম পুনরায় পরিবর্তন করে রাখেন “কৃষক প্রজা পার্টি”। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এর নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি এক গন আন্দোলনের নামে । এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল;

  • কৃষকদের অধিকার পুনরুদ্ধার

  • জমিদার এবং মহাজন অত্যাচার থেকে কৃষকদের মুক্তি

  • জমিদারী উচ্ছেদ এবং সকল জমির প্রকৃত কৃষকদের হস্তান্তর করা ।

এগুলোর কারণে তারা গণ আন্দোলনে নেমে ছিলেন । এর ফলে গরীব এবং মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ এবং কৃষকরা এই কৃষক প্রজা পার্টি তাদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।

 

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ভারতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলেও তার মনযোগ মূলত বাংলাতে ছিল । ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন । তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি যিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিল ।১৯১৬ সাল থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। মুসলিম লীগের কর্মকাণ্ডের এ কে ফজলুল হক খুশি ছিলেন না । ১৯৩৬ সালের নির্বাচনে ফজলুল হক মুসলিম লীগের নেতৃত্ব প্রদানকারী জিন্নাহ এর  বিরোধিতা করেছিলেন । এ কে ফজলুল হক কে ছিলেন বাংলার সকল গোষ্ঠীকে এক করে নতুন বাংলা গড়তে । যা সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন । মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম গোষ্ঠীদের বিচ্ছিন্ন করে তিনি তার বিজয়কে নিশ্চিত করেছিলেন । ফজলুল হক  পটুয়াখালী নির্বাচনে তিনি খাজা নাজিমুদ্দিন কে পরাজিত করেছিলেন ।

 

১৯৩০ সালে লন্ডনে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন। মুসলিম লীগ ওই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলো। ফজলুল হক ওই জায়গায় বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে বলে বাংলা এবং পাঞ্জাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দের প্রতিনিধিত্ব এবং স্বতন্ত্র নির্বাচন এর পক্ষে দাবি জানায় তিনি।

প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। সেখানে বিরোধী দল ছিলেন কৃষক প্রজা পার্টি। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি তৃতীয় বৃহৎ দল রূপে আত্মপ্রকাশ করে। কৃষক প্রজা পার্টি ছিল এ কে ফজলুল হক এর দল। এক্ষেত্রে কংগ্রেস এক নাম্বারে এবং মুসলিম লীগ দুই নাম্বারে ছিল । যার ফলে ফজলুল হক বাংলার একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি বাংলায় কংগ্রেসের সঙ্গে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করে। এই মন্ত্রিসভা গঠন করার জন্য এ কে ফজলুল হক একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সংগঠন নেতারা মন্ত্রিসভা গঠনের বিরোধিতা করে। যার ফলে তিনি কংগ্রেসের মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারে না। তারপর তিনি বাধ্য হয় মুসলিম লীগের সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠন করে। এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা গঠন করে। এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের এর কর্মসূচিকে কার্যকর করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী মুসলিম লীগের অধিবেশন । ওই অনুষ্ঠানের পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক । উক্ত অধিবেশনে তার প্রস্তাব গৃহিত হয় । পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব পাস হয় । পরে প্রথম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাতা হয় । এই “লাহোর প্রস্তাব” পরবর্তীতে “পাকিস্তান প্রস্তাব” নামেও পরিচিত হয় ।

১৯৩৭‌ সাল থেকে দীর্ঘ ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি পরপর দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন । প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি সাধারণ জনগণের জন্য অনেক কাজ করেন । তাদের দুঃখ লাভ করার জন্য তিনি বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে । “ঋণ সালিশী বোর্ড” নামে তিনি একটি সমিতি ও চালু করেন দরিদ্র মানুষের ঋণ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য ‌ । ফলে গরিব চাষিদের সুদখোর মহাজনদের কবল থেকে মুক্তি পায় ‌ । তিনি সকল জনগণের কাছে সুপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল ।

 

১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাবার পর তিনি তার জন্মভূমি ঢাকায় চলে আসেন । ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । অল্পদিনের মধ্যেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি  দাবিতে আন্দোলন শুরু করে । বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে । পুলিশের লাঠিচার্জে ফজলুল হক ও আহত হন । শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। যার জন্য ফজলুল হক বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলায় এক গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয় যা বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন দিক-নির্দেশনার সৃষ্টি করে । ১৯৫৩ সালে ফজলুল হক ” শ্রমিক কৃষক দল” প্রতিষ্ঠা করে ।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী মিলের “যুক্তফ্রন্ট” গঠন করে ।এ কে ফজলুল হক এই জোটের নেতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত । তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় সকল সম্প্রদায়ের লোক কে একসাথে গঠনে অনেক সাহায্য করে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি “যুক্তফ্রন্ট”  দলের নেতৃত্ব দিয়ে পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হন । এরপর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর ভিত্তিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান । পরবর্তীতে আইন সভায় তার দল আওয়ামী মুসলিম লীগের চেয়ে কম আসন লাভ করে । আইন সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পেয়েও তিনি পরপর দুইবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এবং একবার পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ।

 

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান শাসন গৃহীত এবং কার্যকর হবার পর তিনি সেই পথ থেকে চলে আসেন আবার ঢাকাতে । তারপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পান । তিনি দুই বছর এই পদে ছিলেন ।

 

১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে এক দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয় । । যার জন্য তাকে দায়ী করে তাকে গৃহবন্দি করা হয় । আর এরপর থেকে এ কে ফজলুল হক রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর প্রাপ্ত হয় ।

 

১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুন্সিগঞ্জে প্রতিষ্ঠাতা করেন “হরগঙ্গা ” কলেজ । একই সাথে তিনি তার গ্রামে কলেজ স্কুল এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি কলকাতাতেও ইসলামিক কলেজ স্থাপন করেন । প্রতিষ্ঠাতা করেন মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ” ।

 

২০০৪ সালে বিখ্যাত গণমাধ্যম বিবিসি বাংলায় একটি জরিপের আয়োজন করে । 30 দিনের এই জরিপে শ্রোতাদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয় 20 জন সেরা বাঙালি । উক্ত বিজন বাঙালির মধ্যে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের অবস্থান ছিল চতুর্থ নাম্বারে । এরই মাধ্যমে প্রকাশ পায় তার প্রতি মানুষের আন্তরিক এবং অফুরন্ত ভালোবাসা । প্রায় অর্ধ শতক ধরে এ কে ফজলুল হক ছিলেন উপমহাদেশের একজন নামকরা নেতা ।

 

১৯৬২ সালের ২৬ ই এপ্রিল এ কে ফজলুল হক তার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঢাকায় ।

অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!