Menu Close

বেগম রোকেয়া (Begum Rokeya):


বাংলার  নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া । তিনি প্রথম বাঙালি নারীবাদী এবং সংগ্রামী নারী । তার জন্য বাঙালি নারীরা আজ প্রতিষ্ঠিত । তাদের পুরুষের ন্যায় সমান অধিকার আছে । এই সফলতা তিনি এমনি এমনি পায়নি । এর জন্য তাকে নানা সংগ্রাম ও ত্যাগ করতে হয়েছে । একটি সমাজে যদি নারী পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে কাজ করলে সেই সমাজে উন্নতি নিশ্চিত । আর সমাজের এই পরিবর্তনটা বেগম রোকেয়া করতে চেয়ে ছিলেন তার জীবনে ।

বেগম রোকেয়া
begum rokeya

 

জন্ম।                                          ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর

                                                  পায়রা বন্দর , মিঠাপুকুর, রংপুর

                                                  (তত্কালীন ব্রিটিশ , ভারত )

মৃত্যু।                                          ১৯৩২ সালের ৯ ই ডিসেম্বর

                                                 কলকাতা , ব্রিটিশ ভারত

তার তৈরি সংগঠন।                   ”  আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম “(১৯১৫)

জনপ্রিয় গ্রন্থ।                            পদ্মারাগ , অবরোধবাসীনি , মতিচূর।

তার লেখা বই।                           “মতিচূর” ১ ম (১৯০৪)

                                                “সুলতানা ড্রীম “(১৯০৮)

                                                “মতিচূর ” ২য় (১৯২২)

 

বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ৯ ই ডিসেম্বর । রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে , তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত । তুমি রংপুরের সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তার বাবার নাম হল জহিরুউদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার । তার মায়ের নাম রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী । তার বড় একটি বোন এবং বড় দুইটি ভাই ছিল । সেই সময় তাঁর পরিবারের অনেক নামডাক ছিল। তার পরিবারের পূর্বপুরুষগণ ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ পদে  বিভিন্ন সামরিক চাকরি করতেন । তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিচার বিভাগে কাজ করতেন । তারা ছিলেন সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবার ।

 

বেগম রোকেয়া যে সময় জন্মগ্রহণ করেন তখন মুসলিম সমাজের নারীরা শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে অনেকটাই পিছনে ছিল । তাদেরকে শিক্ষা দীক্ষা গ্রহণ করার কোন সুযোগ দেওয়া হতো না । তাদের পর্দা করার জন্য বাধ্য করা হত তার জন্য তারা ঘরের বাইরে যেতে পারত না এবং কোনো শিক্ষা-দীক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না । দেশের শাসনভার থেকে শুরু করে সকল কাজকর্ম পুরুষরাই কত । কিন্তু বেগম রোকেয়া তা মানতে নারাজ ছিলেন । তিনি প্রবল ইচ্ছাশক্তি শক্তির জোরে লেখাপড়া শিখতে আগ্রহী ছিলেন ।

 

বেগম রোকেয়ার বড় দুই ভাই তারা ছিলেন অনেক মেধাবী এবং শিক্ষিত। তারা কলকাতার একটি বিখ্যাত কলেজে পড়ালেখা করতো । সেই কলেজটির নাম হল সেন্ট জেভিয়ার্স । সেখান থেকে তার বড় দুই ভাই উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন । এই শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারে সমাজে পুরুষের সঙ্গে নারীদের অনেক প্রয়োজন রয়েছে । তাদের শিক্ষা লাভ করার সুযোগ দেওয়া উচিত তাহলে সমাচার ও উন্নত হবে । তার জন্য তারার ওকে আর বড় বোন করিমুন্নেসা কে গোপনে পড়ালেখা শিক্ষা দিতো । তার বড় বোন করিমুন্নেসা ইংরেজি শেখার প্রবল আগ্রহ ছিলেন । তাই তার বড় ভাই তাকে ইংরেজি শেখাতে রাতের অন্ধকারে ঘরে সবার অগোচরে । আস্তে আস্তে রোগে আর বড় বোন ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয় । সেই সঙ্গে তিনি বাংলা সাহিত্যের অনেক জ্ঞান লাভ করেন তার বড় দুই ভাইয়ের কাছ থেকে।

 

বেগম রোকেয়ার ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল । বিশেষ করে বাংলার সাহিত্য ও ইংরেজির বিষয়ের উপর । তার আগ্রহ দেখে তার বড় ভাই এবং বড় বোন থাকে শিক্ষা দেওয়া শুরু করে । রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাহেব এবং করিমুন্নেসা বাংলা সাহিত্য এবং ইংরেজি শিক্ষা দিতে থাকে । তখন রোগের বাংলা সাহিত্যের উপর প্রবল জ্ঞান লাভ করে। এইভাবে তিনি পরিবারের সবার আড়ালে গোপনে তার বড় বোনের কাছে শিক্ষা নিতে থাকেন । আস্তে আস্তে তিনি বাংলা সাহিত্য এবং ইংরেজি বিষয়ের উপর অনেক জ্ঞান লাভ করেন । এবং তার মনে হয় নারীদের উপর অন্যায় করা হচ্ছে তাদের শিক্ষা দেওয়া উচিত । বেগম রোকেয়ার পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজন ঊর্ধ্ব এবং আরবি শিক্ষা উপর অতোটা আপত্তি করত না ।কিন্তু বাংলা বিষয়ে শিক্ষা লাভ করার ঘর বিরোধিতা করেছিলেন তারা । বকেয়া তাদেরকে উপেক্ষা করে বাংলা রচনা এবং সাহিত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন ।

 

১৯৯৮ সালে বেগম রোকেয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় মাত্র ১৮ বছর বয়সে । তার স্বামী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট । তার নাম ছিল সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন । তিনি অনেক শিক্ষিত মানুষ ছিলেন তার জন্য নারী শিক্ষার তার কোন বিরোধিতা ছিল না । আরো তিনি এটাই মনে করতেন যে নারীদের শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া উচিত । তারপর

 তার সাথে তার বিয়ে হবার পর তার স্বামীর সহযোগিতায় বেগম রোকেয়া বাংলা সাহিত্যের প্রতি আরও জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পায় । তারপর তার স্বামীর কাছ থেকে ইংরেজি ,ফারসি,বাংলা এবং উর্দু ভাষা শিখতে থাকেন । এবং তাতে তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন ।

 

সাহিত্যিক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ হয় ১৯০২  সালে । তিনি সাহিত্য লিখতে থাকেন । তার প্রথম সাহিত্যে বাংলা রচনা ” পিপাসা”  লিখে । তার এই রচনা ভারতের জনপ্রিয় পত্রিকা “নবপ্রথায়” ছাপা হয় । এই লেখার জন্য তিনি আরও সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ।  এরপর থেকে তিনি উৎসাহ পেয়ে আরো বিভিন্ন রচনা লিখতে থাকে। আর তা জনপ্রিয় গণমাধ্যম এবং পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে । এরপর তিনি ইংরেজিতে রচনা লিখতে থাকেন । তার প্রথম ইংরেজি ভাষার রচনার নাম হল “সুলতানা ড্রিম” । এই ইংরেজী রচনাটি মাদরাসের একটি জনপ্রিয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় । তার এই রচনা প্রকাশের পর সবার ন এরজরে তিনি চলে আসেন । আর তার পরে তিনি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ।

 

তার এই জনপ্রিয়তা সব সময় তার পাশে ছিলেন তার স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন । কিন্তু বেশিদিন তিনি তাকে পাশে পাননি ।  ১৯০৯ সালে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন পরলোক গমন করে ।  তার মৃত্যুর পর তাকে স্মরণীয় করার জন্য বেগম রকেয়া ভাগলপুরে তার নামে একটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করে । তিনি যখন এই গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠাতা করে তখন সেই স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ছিল

মাত্র আটজন । পরবর্তীতে তিনি লোকজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার মেয়েকে শিক্ষিত করার তাগিদ দিতে থাকেন । প্রথমে তার কথায় কেউ রাজী হতে চায়নি । কিন্তু তাতে তিনি থামিনি তিনি তাঁর এই প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন এবং প্রত্যেকটি মেয়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের শিক্ষিত হবার জন্য তাগিদ দিতে থাকেন । তিনি বাঙালি মুসলিম মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য অনেক কষ্ট করতে থাকেন । তিনি বুঝাতে থাকেন মেয়েরা সমাজের বোঝা পরিবারের বোঝা নয় তাদের শিক্ষিত করলে তারা বড় হয়ে তাদের পরিবারের হাল ধরতে পারবে । সমাজে যেসব উচ্চপদে পুরুষগণ চাকরি করে সেই পদগুলোতে তাদের মেয়েও চাকরি করার সুযোগ পাবে । তখন তার মেয়েরাই তার পরিবারের হাল ধরতে পারবেন । তার এই প্রচেষ্টার জন্য তার গার্লস স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে । এইভাবে বাংলার মুসলিম পরিবারের মেয়ে গুলো আস্তে আস্তে শিক্ষার আলোর দিকে এগোতে থাকে ।

 

তিনি সকল মহিলাদের একসঙ্গে করার লক্ষ্যে ১৯১৫ সালের একটি সংগঠন চালু করেন । তিনি ওই সংগঠনের নাম রাখেন “আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম” । সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের দুস্ত এবং অসহায় নারীদের সাহায্য করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা । এই সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের বিভিন্ন হাতের কাজ শেখানো হতো । এবং এই সংগঠনের ভিতরে নারীদের শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ ছিল । এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলেন ।

 

এইসব কাজের ফাঁকে তিনি বিভিন্ন বই রচনা করতে থাকেন । তিনি মোট পাঁচটি বই রচনা করেন । তিনি যে বই রচনা করেন সেগুলো হলো –

(১) মতিচুর প্রথম খন্ড (১৯০৪)

(২) সুলতানা ড্রিম (১৯০৮)

(৩) মতিচুর দ্বিতীয় খন্ড (১৯২২)

(৪) পদ্মরাগ (১৯২৪)

(৫) অবরোধসিনি(১৯৩২)

তার এই বইগুলো শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বের দরবারে অর্জন করে নিয়েছিল একটি বিশেষ সম্মান । বাংলা ভাষাকে তিনি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন এই বইগুলো প্রকাশের মাধ্যমে । বেগম রোকেয়া ছিলেন এই উপ-মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান নারী । তার এই প্রতিভার জন্য এবং তার সকল কর্মকান্ডের জন্য তাকে ” নারী জগতের অগ্রদূত” বলা হয় ।

 

বেগম রোকেয়া যা যা লিখতেন তার মধ্যে নারীদের মুক্তির কথা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত । তিনি সব সময় নারীদের প্রাপ্য অধিকার তাদের দেওয়ার জন্য লড়াই করে যেতেন । নারীরা সুযোগ পেলে পুরুষদের তুলনায় কোনো কিছু কম করতে পারে না তারা পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজের উন্নয়ন করতে পারবে ‌ । তার এই প্রচেষ্টায় তিনি বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীদের অনেকটাই শিক্ষিত করে তুলতে পেরেছিলেন । তারা শিক্ষিত হয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে তারা পুরুষদের তুলনায় কম কিছু যায় না । তারা সমাজে যে সমস্ত কাজ পুরুষগণ করতে পারে সে সমস্ত কাজগুলো নারীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে করতে পারে । এজন্য জ্ঞানীগুণী মানুষ গান সব সময় বলে গেছেন এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার অর্ধেক পুরুষ খান এবং বাকি অর্ধেক নারীগণের প্রচেষ্টায় সৃষ্টি । বেগম রোকেয়ার নিজের আত্মবিশ্বাস এর জোরে তিনি নারীদের শিক্ষার আলো গ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ।

 

২০০৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম বিবিসি বাঙালি প্রতিভাবান ব্যক্তি এবং কবিদের প্রতি একটি জরিপের আয়োজন করে । ২৬ এ মার্চ থেকে এই জরিপ ৩০ দিন পর্যন্ত শ্রোতাদের প্রত্যক্ষ ভোটের উপর চালানো হয় ।  যেখানে বাঙালি শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান ও এবং জ্ঞানীদের জন নির্বাচিত হয় । যার মধ্যে বেগম রোকেয়া ষষ্ঠতম অবস্থানে ছিলেন । বাংলার মানুষ বেগম রোকিয়া কে কতটা সম্মান করেন এবং ভালবাসেন তারা তাদের এই ভোটের মাধ্যমে সেটা সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন । তার লেখা বই “সুলতানা ড্রিম” বিশ্বের নারী জাগরণের মাইলফলক হিসেবে তার এই বইটি স্বীকৃতি দেওয়া হয় ।

 

এই মহান নারী ১৯৩২ সালের ৯ ই ডিসেম্বর কলকাতা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে মৃত্যুবরণ করেন ।

অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!