Menu Close

মাদার তেরেসা (Mother Teresa):


মানুষ মানুষকে ভালবাসবে , সবসময় একে অন্যের পাশে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবসময় এটা দেখা যায় না। এর উল্টোটাই বেশি দেখা যায়। আবার এমনও মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুগে পৃথিবীতে আসে যারা মানুষের সেবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়। ভালোবাসা দিয়ে জয় করে নেয় সারা দুনিয়া। মাদার তেরেসা (Mother Teresa) তেমনি একজন মানব দরদী।

জন্মঃ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট, আলবেনিয়া , স্কপিয়া
পেশাঃসন্ন্যাসীনি , ধর্ম প্রচারক
জাতীয়তাঃভারতীয়
পরিচিত লাভঃদ্যা মিশনারিজ অফ চ্যারিটি
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারঃনোবেল পুরস্কার (১৯৭৯), ভারতরত্ন (১৯৮০)
মৃত্যুঃ১৯৯৭ সালের ৫ ই সেপ্টেম্বর(৮৭বছর), কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

বাল্যকালঃ


মাদার তেরেসার জন্ম হয় আলবেনিয়া স্কপিয়া তে। ২৬ আগস্ট ১৯১০ সালে তার জন্ম হয়। তার বাবার নাম নিকোলাস বোঝাজিউ। তিনি বাড়িঘর তৈরি করার কারবারি করতেন। মাদার তেরেসার মায়ের নাম ছিল দ্রানাফিল বার্নাই। মাদার তেরেসার জন্মের পর পরিবারের পদবী অনুসারে তার নাম রাখা হয়েছিল অ্যাগনেস গোনজা বোঝাজিও। তার বড় তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বড় হয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণের পর তার নাম রাখা হয় মাদার তেরেসাচ।

মাদার তেরেসার জন্মের কিছুদিন পর যখন তিনি খুবই ছোট তখন ইউরোপ , এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত এই ভয়াবহ যুদ্ধ চলতে থাকে। বহু মানুষ মারা যায় এবং ঘরবাড়ি হারায়। তাদের প্রিয়জনদের অনেকের মৃত্যু হয় এ ভয়াবহ যুদ্ধে। এইসব দেখে মাদার তেরেসার কোমল মনে প্রচন্ড আঘাত লাগে। ঠিক এর পরই তার বাবার মৃত্যু হয়।‌ তার পরিবারে নেমে আসে বিপর্যয়। তখন সে অল্প বয়স থেকেই তার ভিতরে ইচ্ছা জাগে মানুষের উপকার করে।

মানব সেবাঃ


মাদার তেরেসা, mother teresaমাদার তেরেসার বয়স যখন ১৮ তখন তিনি ” লরেটো সিস্টার্স ” নামে খ্রিষ্টান মিশনারি দলে যোগ দেন । দার্জিলিং এ ” লরেটো সিস্টার” এর আশ্রমে তিনি তিন বছর “নান” এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। বাঙ্গালীদের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে তিনি বাংলা ভাষাকে রপ্ত করে নেয়। এরপর তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং কলকাতার একটি বিখ্যাত স্কুল মেরি’জ এ যোগ দেন। তিনি ওই স্কুলে একটানা ১৭ বছর শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে। এই সময় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি মানুষের উপকার করার এবং তাদের দুঃখ-বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়াবার শিক্ষা দেন। টিফিন থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে পাশের বস্তিতে গরীব মানুষদের দান করতে উৎসাহী করতেন তিনি। এরকম বিভিন্ন নৈতিকতার শিক্ষা দিতেন।

বাংলার গরিব মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র দেখে তিনি খুবই বিচলিত হত। সব সময় মনে মনে ভাবতো কি করে তাদের সাহায্য করা যায়। এরপর ১৯৪৮ সালে তিনি লরেটো থেকে বিদায় নেন। বাঙ্গালীদের সাথে কাজ করার জন্য তিনি নিজেও বাঙালির মতই থাকতে চেয়েছেন এর জন্য তিনি গাউন ছেরে শাড়ি পড়তে শুরু করে। সেই তখন থেকে তার কাছে তিনটের বেশি শাড়ি থাকতো না একটি পড়ার জন্য, একটি ধোয়ার জন্য, আরেকটি কোন অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। তার হাতে সেরকম কোন টাকা পয়সা ছিল না কিন্তু মানুষের উপকার করার জন্য তার ভিতরে ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস।
এর ফলে তিনি কলকাতার নোংরা একটি বস্তিতে নিজেই একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তার হাতে তেমন টাকা পয়সা ছিল না তার জন্য তার স্কুলের টেবিল ,চেয়ার ,বেঞ্চ কিছুই ছিল না তিনি শুধু মাটিতে দাগ কেটে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখা শিখাতেন। বস্তির অসুস্থ মানুষের কষ্ট দেখে তিনি ওই জায়গায় একটি চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণ করেন । তার এই মহৎ কাজ দেখে তার পাশে অনেক মানুষ এসে দাঁড়ায়। অনেক “নান” ও তার পাশে এসে দাঁড়ায়। এইভাবে তার কাজের পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। আর তাদের সবাইকে নিয়ে গড়ে ওঠে মানবতার সংঘ “মিশন অফ চ্যারিটি “।

যারা সবচেয়ে গরিব যারা সবচেয়ে দুঃখী এবং যাদের কিছু নেই তাদের সেবা করাই ছিল মাদার তেরেসার মূল লক্ষ্য । মৃত্যুমুখী অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবার জন্য তিনি কলকাতায় ১৯৫২ সালে “নির্মল হৃদয়” নামে একটি ভবন তৈরি করেন। এখানে তিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে নিয়ে আসতেন এবং তাদের সেবা যত্ন করতেন। কলকাতায় রাস্তায় অনেক দরিদ্র মানুষ তাদের প্রায় মৃত্যুপ্রায় অবস্থায় এবং ধুকে ধুকে অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করতে দেখে তিনি তাদের সবাইকে এই ভবনের নিয়ে আসতেন এবং নিজের যথাসম্ভব তাদের যত্ন করতেন। এই ভাবে কলকাতার দরিদ্র মানুষকে বুকে তুলে নেয় এই মহৎ নারী।

মাদার তেরেসার শিশুদের প্রতি ছিল প্রবল ভালোবাসা। তিনি সকল শিশুকে অনেক ভালোবাসতেন বিশেষ করে যেই শিশু দরিদ্র এবং তাদের মা-বাবার ভালোবাসা থেকে দূরে। এই সব শিশুদের জন্যই তিনি তৈরি করেন “শিশুভবন”। সকল দরিদ্র শিশুদের এই ভবনে তিনি নিয়ে আসতেন। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিতেন তিনি। একই সঙ্গে তাদের খেলাধুলা এবং বিনোদন এর ব্যবস্থার দিকে নজর রাখেন তিনি। এরকমভাবে যেসব শিশুরা রাস্তায় ঘোরাফেরা করত, নোংরা এবং বিপদজনক কাজ করত সেসব শিশুদের এই ভবনের নিয়ে আসতেন এবং তাদের মানব দরদী করে তুলতেন। তাদের পরোপকারী করার শিক্ষা দিতেন।

মাদার তেরেসা যতদিন বেঁচেছিলেন কোন না কোন মহৎ কাজ তিনি করেছেন। তার মহৎ কাজের শেষ নেই। তেমনি একটি মহৎ কাজ করে দেখিয়েছিলেন কুষ্ঠ রোগীদের সাহায্য করে। আর এই কুষ্ঠ রোগীদের জন্য তিনি তৈরি করেন ” প্রেম নিবাস”।সেই সময় ভারতে প্রায় জায়গায়  কুষ্ঠরোগীদের দেখা যেত। তাদের সমাজে অবহেলা করা হতো এবং তাদেরকে লোকজনের কাছ থেকে দূরে রাখা হতো। তারা সমাজে ছিল অবহেলীত। মাদার তেরেসা এদেরকে তার প্রেম নিবাসে নিয়ে আসেন এবং নিজ হাতে তাদের গা ধুয়ে দিতে এবং স্নান করিয়ে দিতেন। এর ফলে কুষ্ঠ রোগীরা নতুন আরেকটি জীবন পেয়ে যায়। প্রেম নিবাসে তারা খুব ভালো ছিল বাহিরের সমাজের চেয়ে। পরবর্তীতে প্রেম নিবাসের আরো অনেক শাখা তৈরি করা হয়। তার এই মহৎ কাজ দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত এবং নিজেরাও যথা সম্ভব করার চেষ্টা করত।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের যখন ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীরা বাঙালিদের ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার শুরু করে। ফলে অনেক লোক তাদের বাড়ি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রায় ১ কোটি বাঙালি আশ্রয় নেন। এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থী রাখা সহজ ছিল না। মাদার তেরেসা নিজে দুর্গত শরণার্থীদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং তাদের যথাসম্ভব সাহায্য তিনি করতেন। ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম বাংলাদেশে আসেন, তখন বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের ঢাকার ইসলামপুরে প্রথম ” মিশন অফ চ্যারিটি ” শাখা স্থাপন করেন। এরপর সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটে তৈরি করা হয় “নির্মল হৃদয়” ও “শিশু ভবন”। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয় এতে বহু লোকের প্রাণ যায় এবং বহু লোক ভূমিহীন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ৮১ বছর বয়সের মাদার তেরেসা ছুটে আসেন বাংলাদেশ এবং নিজ হাতে তিনি অসহায় মানুষদের সেবা করতে থাকে।

মানব সেবা মানুষকে কত বড় করে তুলতে পারেন সেটাই দেখিয়েছিলেন মাদার তেরেসা । মাদার তেরেসা জীবনে নিজের জন্য কিছু করেননি তিনি সকল কিছু অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন । তিনি যে এ জীবনে যত পুরস্কার পেয়েছেন তার সকল অর্থই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে। তার এই মহৎ কাজের জন্য তাকে ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় । তিনি সেই টাকাও দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা এই নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর সুইডেনে এক জনসভার আয়োজন করা হয় ।কিন্তু মাদার তেরেসা বলেছিলেন এই জনসভা না করে তার অর্থ গরীব ও অসহায় মানুষকে বিলিয়ে দিতে। তার এই কথা শুনে সুইডেনের দেশবাসী এবং আরো অনেক মানুষ ছাত্র-ছাত্রী তারা সবাই মাদার তেরেসার কথায় সাড়া দেয়। তারা সবাই মিলে যে অর্থ উঠেছিলেন তার মূল্য ছিল নোবেল পুরস্কার এর অর্ধেক।

মৃত্যুঃ


১৯৯৭ সালের ৫ ই সেপ্টেম্বর এই মহান নারী মৃত্যুবরণ করেন। এই মহৎ নারীর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের নিজেদের জীবনে এর প্রভাব বিস্তার করা উচিত । মানুষ একে অন্যকে সাহায্য করলে তাদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ালে পৃথিবীটা সুন্দর ও শান্তিময় হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্রঃ


অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!