Menu Close

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুঃ

জগদীশ চন্দ্র বসু (Jagadish Chandra Bose) ছিলেন একজন বাঙালি বিখ্যাত পদার্থবিদ জীববিজ্ঞানী এবং কল্পবিজ্ঞান রচয়িতা । বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে । তার হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশের ব্যবহারিক এবং গবেষণাধর্মী বিজ্ঞান সূচনা করেন ছিলেন।
তিনি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন যার মাধ্যমে তার ছাড়াই তথ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আদান-প্রদান করা যেত । তার গবেষণার সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে আজ রেডিও টিভি এবং ইন্টারনেট কাজ করে আজ রেডিও, টিভি এবং ইন্টারনেট কাজ করে।

জন্মঃ30 শে নভেম্বর 1858 সালে, বিক্রমপুর, মুন্সিগঞ্জ জেলা, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত
পেশাঃপদার্থবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী, জৈব পদার্থ বিজ্ঞানী, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, প্রত্নতত্ত্ববিদ, সাহিত্যিক
নাগরিকত্বঃব্রিটিশ ভারত
আবিষ্কারঃমিলিমিটার তরঙ্গ, ক্রেসকোগ্রাফ, উদ্ভিদের প্রাণ প্রমাণ
শিক্ষাঃকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারঃসিআইই  (1903), সিএসআই  (1911), নাইট ব্যাচেলর ( 1917)
উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দঃসত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, শিশির কুমার মিত্র, দেবেন্দ্র মোহন বসু
মৃত্যুঃ23 শে নভেম্বর 1937 সালে, গিরিডি ,  তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ

জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর মুন্সিগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । এই অঞ্চলটি তখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত ছিল কিন্তু পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় । বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে তাদের পরিবারের বাসস্থান ছিল । তার পিতার নাম হল ভগবান চন্দ্র বোসু । তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্ম বলি । তিনি তখন ফরিদপুর জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন । এর পূর্বে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন । তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক । তারপরের দিনই বিভিন্ন অঞ্চলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছিলেন । জগদীশচন্দ্র বসুর মায়ের নাম ছিল বামা সুন্দরী দেবী।

জগদীশ চন্দ্র বসু
জগদীশ চন্দ্র বসু

শিক্ষাজীবনঃ

জগদীশ চন্দ্র বসুর বাবা তখন ইংরেজি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও ভগবান চন্দ্র নিজের ছেলেকে ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করাই নি । তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলে যেন একজন আদর্শ দেশ প্রেমিক হন ।ভগবান চন্দ্র চেয়েছিলেন তার পুত্র এই দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশে একজন মানুষ হোক এবং তার মধ্যে প্রকৃত দেশ প্রেম সৃষ্টি হোক।
তাই তিনি জগদীশ চন্দ্র বসু কে কে নামের একটি বাংলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে ছিলেন । জগদীশচন্দ্র বসুর প্রথম স্কুল ছিল ময়মনসিংহ জেলা স্কুল । জগদীশচন্দ্র বসুর ও বাংলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার একটা যুক্তি ছিল । তিনি মনে করতেন ইংরেজি ভাষা শেখার আগে এই দেশের মাতৃভাষা শেখা প্রয়োজন।

১৮৭৯ সালে তিনি গ্রামের স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে তিনি কলকাতায় চলে যান । কলকাতার বিখ্যাত কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন । এই স্কুলে তিনি পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । তিনি এই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।
এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হন । সেখান থেকে তিনি “ন্যাচারাল সাইন্স” ডিগ্রী অর্জন করে।
১৮৮০ সালে তিনি তার বাবার ইচ্ছা ও নিজের আগ্রহে লন্ডনে পাড়ি দেয় । চিকিৎসা বিজ্ঞান পাঠের জন্য তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন । কিন্তু জগদীশচন্দ্র বসু অসুস্থতার কারণে বেশিদিন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি।
১৮৮৪ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করে।
১৮৮৫ সালে তিনি আবার ভারতবর্ষে ফিরে আসেন।

কর্মজীবনঃ

জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতবর্ষে ফিরে এসে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন । তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন । প্রথমদিকে কলেজের অধ্যক্ষ জগদীশচন্দ্র বসু কে নিয়োগ দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন । তার জন্য জগদীশচন্দ্র বসু কে গবেষণা করার জন্য কোন সুযোগ দেওয়া হতো না । জগদীশচন্দ্র বসু কে কলেজ থেকে অর্ধেক বেতনেরও কম টাকা দেওয়া হতো।
যার জন্য জগদীশচন্দ্র বসু দৃঢ় সংকল্প করেন যতদিন না পর্যন্ত তার বেতন ইংরেজদের বেতনের সমান এবং সম্মান না দেওয়া হবে ততদিন পর্যন্ত তিনি প্রতিবাদ করবেন । ফলে জগদীশচন্দ্র বসু  দীর্ঘ তিন বছর বেতন ছাড়া ওই কলেজে অধ্যাপনার কাজ করেন । তারপরে তার বেতন ও অন্যান্য শিক্ষকদের বেতনের সমান করা হয়েছিল।

বিবাহঃ

১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে “অবলার” বিয়ে হয় । তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের বিখ্যাত দুর্গা মোহন দাসের কন্যা । বিয়ের পরও অবলা পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম যার জন্য তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল । কিন্তু তখন তার ভর্তি নেওয়া হয়নি । কারণ সেই সময় মেয়েদের সেখানে পড়ানো নিষেধ ছিল । তবে তিনি তারপরেও অনেক ভাবে মেডিকেল বিষয়ে লেখা পড়া করার চেষ্টা করতে থাকেন।

১৮৮২ সালে অবলা পড়ালেখার উদ্দেশ্যে মাদ্রাজে চলে যান । মাদ্রাজে গিয়ে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করতে শুরু করে । কিন্তু অসুস্থতার জন্য বেশি দিন তিনি পড়ালেখা করতে পারিনি । পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তিনি আবার  দেশে ফিরে আসেন।
জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে যখন অবলার প্রিয় হয়েছিল তখন তাদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না । তার উপর তিনি তখন প্রতিবাদ করার জন্য কলেজ থেকে বেতনও নেননি । তার ওপর আবার তার বাবার কিছুই ঋণ ছিল । যার জন্য তাদের পথে বসতে হয়।

তারপর জগদীশ চন্দ্র বসু এবং অবলা একসাথে কাজ করে তাদের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হয় । তারা আর্থিক দিক দিয়ে সক্ষম হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই তার মা-বাবা মারা যান।

অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি এবং প্রেরনঃ

জগদীশ চন্দ্র বসুর যখন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতা করছিলেন তখন ওই কলেজে গবেষণার জন্য তেমন ভাল সুযোগ সুবিধা ছিল না । জগদীশচন্দ্র বসুর ছোট একটা ঘরের মধ্যে তিনি তাঁর গবেষণা চালাতে।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যায়নের প্রথম ১৮ মাস তিনি গবেষণা চালিয়ে ছিলেন । তার এই গবেষণার সকল ডকুমেন্ট লন্ডনেও প্রকাশ হয়েছিল।

প্রতিদিন চার ঘন্টা শিক্ষকতা করার পর দিনের প্রায় সকল সময় তিনি গবেষণার করতেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর এই ১৮ মাস গবেষণার মধ্যে মুখ্য বিষয় ছিল অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি করা । ১৮৯৫ সালে তিনি অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন । তারপর তিনি গবেষণা করতে থাকেন কিভাবে এটিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিনা তারের মাধ্যমে পাঠানো যায় । তারপর তিনি এই ক্ষুদ্র তরঙ্গ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিনা তারের মাধ্যমে পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জগদীশচন্দ্র বসু প্রায় ৫ মি.মি. তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরি করেন। এই অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট্য তরঙ্গকে বলা হয় মাইক্রোওয়েভ । আধুনিক যুগে রাডার, টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গ ব্যবহার হয়।
তার এই আবিষ্কারের ফলে সকলের নানা কাজে ব্যবহার করে তাদের কর্মকান্ড আগের তুলনায় আরও অনেক সহজ করে দিয়েছে । তার এই বেতার তরঙ্গ সর্বপ্রথম সমুদ্রের জাহাজের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল । তাদের আবহাওয়ার পূর্বভাস এবং সকল তথ্য বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো । আরো নানা কর্ম ক্ষেত্রে তাঁর এই আবিষ্কার ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছিল।

আমরা বর্তমানে যে তারবিহীন ইন্টারনেট ব্যবহার তার প্রথম সূচনা হয়েছিল এই বেতার তরঙ্গ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।

সম্মাননাঃ

জগদীশ চন্দ্র বসু তার জীবনে নানা আবিষ্কার এবং আদর্শ দেশ প্রেমের জন্য অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন । তিনি তার জীবনে নানা পুরস্কার অর্জন করেছিলেন । তার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হল,

  • নাইটহুড , ১৯১৬ সালে
  • রয়েল সোসাইটির ফেলো , ১৯২০ সালে
  • ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস, ১৯২৭ সালের ১৪ তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন
  • ভিয়েনা অ্যাক্যাডেমি অফ সাইন্স , ১৯২৮ সালে সদস্য লাভ

এছাড়াও ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ২০ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচন করেছিলেন । যার মধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু সপ্তম স্থানে ছিলেন । এর মাধ্যমে বাঙালিরা জানিয়ে দিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বসুর প্রতি তাদের সম্মাননা।

এছাড়াও তিনি বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ।

মৃত্যুঃ

১৯৩৭ সালে ২৩ শে নভেম্বর ভারতের গিরিডিতে জগদীশ চন্দ্র বসু মৃত্যু বরণ করেন।

তথ্যসূত্রঃ

১। উইকিপিডিয়া

২। সব বাংলায়ন

অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!