Menu Close

ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহঃ

ব্রিটিশ ভারতের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষক এবং দার্শনিক । তিনি ব্রিটিশ ভারতে (চব্বিশ পরগনা পশ্চিমবঙ্গ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তর্ক বিতর্কের মাধ্যমে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করেন । বাঙালি চেতনা বিকাশে তিনি অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ।

জন্মঃ১৮৮৫ সালের ১০ শে জুলাই, চব্বিশ পরগনা পশ্চিমবঙ্গ, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত
পেশাঃঅধ্যাপনা , দার্শনিক
পরিচিতি লাভের কারণভাষাবিজ্ঞানী, বহুভাষাবিদ বিশিষ্ট দার্শনিক
শিক্ষাঃপিএইচডি
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারঃস্বাধীনতা পুরস্কার. একুশে পদক
মৃত্যুঃ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই, ঢাকা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান

 

জন্মঃ

১৮৮৫ সালের ১০ শে জুলাই ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছোট সময় থেকেই বাংলা ভাষার সাধনের বকরি তৎপর ছিলেন । বাংলা ভাষা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল।

মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
১৯৫৪ সালে কার্জন হলে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কাজী মোতাহার হোসেন

শিক্ষাঃ

ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাশ করেন। এন্টান্স পাশ করার আগ থেকেই তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখতে শুরু করেন  । পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন । ১৯০৬ সালে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ পাস করেন । ১৯১০ সালে তিনি সিটি কলেজ কলকাতা থেকে সাংস্কৃতিক বিষয়ে সম্মাননাসহ বি.এ ডিগ্রী লাভ করেন । তারপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়ন শুরু করে । ১৯১২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন । তারপর তিনি পিরিচে চলে যান এবং সেখানকার সর্বন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হন । ১৯২৮ সালে তিনি সেখানে থেকে ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন ।

তিনি তার শিক্ষাগতা শেষ করার আগে যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পেশাঃ

ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ (Dr. Muhammad Shahidullah) যশোর জিলা স্কুলের শিক্ষক ও তার মধ্য দিয়ে তিনি তার কর্মজীবনে পা রাখেন । সেখানে তিনি বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর  সীতাকুন্ড হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন । তিনি সেখানে বেশি দিন শিক্ষকতা করেন নি মাত্র এক বছর শিক্ষকতা করার পর তিনি ২৪ পরগনায় তিনি আইন ব্যবসা শুরু করেন । ১৯১০ সালে কলকাতার হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে বেদ পাঠের অনুমতি পায় । ১৯২১ সালে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত এবং বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন । সেই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সময় আইন বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । ১৯৩৭ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং রিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন । ১৯৪৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করার পর তিনি বরগুনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করে । ১৯৫৩ সালে তিনি পুনরায় আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ফারসি ভাষার খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব পালন শুরু করে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দুই বছর শিক্ষকতা করার পর তিনি ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি এবং পলি বিষয়ে বিভাগে যোগদান করেন ।‌ ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করার পর সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা এবং সে সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান লাভ করার আগ্রহ ছিল । তাই তিনি তার শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা শিখেছেন । তিনি তার জীবনের প্রায় ২৮ টি ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন । এরমধ্যে ১৮ ভাষার ওপর তিনি উল্লেখযোগ্য পন্ডিত করেছিলেন । এই ১৮ টি ভাষার নাম হল,

  1. বাংলা ভাষা
  2. উর্দু ভাষা
  3. ফারসি ভাষা
  4. আরবি ভাষা
  5. ইংরেজি ভাষা
  6. অসমীয়া ভাষা
  7. গুড়িয়া ভাষা
  8. মৈথিলী ভাষা
  9. হিন্দি ভাষা
  10. পাঞ্জাবি ভাষা
  11. গুজরাতি ভাষা
  12. মারাঠি ভাষা
  13. কাশ্মীরি ভাষা
  14. নেপালি ভাষা
  15. সিংহলি ভাষা
  16. তিব্বতি ভাষা
  17. সিন্দি ভাষা
  18. সংস্কৃত ভাষা
  19. পালি ভাষা

এরমধ্যে উর্দু ভাষার অভিধান প্রকল্পে তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আদর্শ প্রকল্প অভিধান এর সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেন । তিনি বাংলা একাডেমীর ইসলামী বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন । ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ 1963 সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক বাংলা একাডেমি পঞ্জিকা তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন । ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে সর্বপ্রথম বাংলা পঞ্জিকা আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়।

ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহিত্যকর্মঃ

ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছোটবেলা থেকে সাহিত্য কর্মের উপর নিযুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তিনি বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিযান তৈরি করে বাংলা ভাষায় অসামান্য অবদান  । তিনি এম এ পাশ করার পরে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক হন । ১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । তিনি ঊর্ধ্ব অভিযান প্রকল্প ও সম্পাদক ছিলেন । ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার জীবনে তিনি অনেক সাহিত্যকর্ম লিখেছিলেন ।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের নাম হল, 

  • দিওয়ানে হাফিজ
  • বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত
  • ভাষা ও সাহিত্য
  • ইসলাম প্রসঙ্গ
  • বিদ্যাপতি শতক
  • বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান
  • টেইল ফ্রম দি কুরআন
  • ব্যাকরণ পরিচয়
  • বাংলা ভাষার ব্যাকরণ

ভাষা আন্দোলনে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভূমিকাঃ

বহুভাষাবিদ , পন্ডিত এবং অন্যতম ভাষা বিজ্ঞানী হিসেবে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি।ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয় করে একটি উক্তি হলো,

“আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি”

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তা নিয়ে বিতর্ক হতে শুরু করে ।‌ বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সম্মাননা দেওয়ার জন্য যে কজন ব্যক্তি প্রতিবাদ করেছিলেন তার মধ্যে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছিলেন অন্যতম । তার এই অসামান্য ভূমিকার ফলে বাঙালি ভাষা আন্দোলনের পথ অনেকটা সুনির্দিষ্ট এবং প্রশস্ত হয়েছিল।

২০০৪ সালে বিবিসি প্রত্যক্ষ বাঙ্গালীদের ভোটের মাধ্যমে এক জরিপের আয়োজন করেছিলেন । যেখানে শীর্ষ ২০ বিখ্যাত বাঙালির নাম উঠে এসেছে। যার মধ্যে ১৬ অবস্থানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অবস্থান ছিল।

পুরস্কারঃ

১৯৬৭ সালের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ফ্রান্সের সরকার সম্মানজনক পদক “নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স” দেয় । ঢাকা সাংস্কৃতিক পরিষদ তাকে “বিদ্যাবাচস্পতি” উপাধিতে ভূষিত করে ।‌ ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান আমল থেকে তাকে লোকজন “প্রাইড অফ পারফরম্যান্স ” পদক দেন । ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ কালচারাল রিলেশন তাকে সম্মানজনক সদস্য রূপে মনোনীত করেন । কিন্তু পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার অনুমতি না দেওয়ায় তিনি সেই পদক গ্রহণ করেন নি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে মরণোত্তর ডি.লিট উপাধি দেন  । এছাড়াও  তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয় । ১৯৮০ সালে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয় । এছাড়াও তিনি তার জীবনের ছোট ছোট অনেক পুরস্কার অর্জন করেছিলেন ।

মৃত্যুঃ

১৯৬৯ সালের ১৩ ই জুলাই ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন । ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয় । ভাষা সাহিত্যের তার অমর অবদান এর ফলে ওই একই বছরে ঢাকা হল এর নাম পরিবর্তন করে শহীদুল্লাহ হল রাখা হয়েছিল । ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম অনুসারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলাভবনের নামকরণ করা হয়েছিল।

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের গবেষণার জন্য তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সবার মাঝে।

তথ্যসূত্রঃ

১। উইকিপিডিয়া

অন্যান্য পোস্টসমূহঃ

error: Content is protected !!